সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Saturday, 21 Oct 2017

তাজউদ্দীন:

জিয়া পরিবারের বড় ছেলে জনাব তারেক রহমান। বাবার অনুসৃত পথে সারাবাংলার গ্রামে গঞ্জে অবিরাম হেঁটে হেঁটে মানুষের মাঝে থাকার রাজনীতি শুরু করেন তিনি। মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকে শহীদ জিয়ার স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়ান। মাটি ও মানুষের নেতা হয়ে ওঠেন তারেক রহমান। দল তাকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি নিরলস পরিশ্রম করে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করেন। তৃণমূল প্রতিনিধি সভার মাধ্যমে দলের সবশ্রেণীর নেতাকর্মীদের জাতীয়তাবাদী আদর্শে শিক্ষিত ও উজ্জ্বীবিত করে তোলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে সুশাসন ও উন্নয়নের মধ্যদিয়ে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। ধীর ধীরে তিনি দেশনায়কে পরিণত হন। দেশের মানুষ আগামীর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তারেক রহমানকে স্বপ্ন দেখতে থাকেন। দলে তার সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে শক্তিশালী অবস্থান নির্মিত হয়।

কিন্তু দেশবিরোধী শক্তির চক্রান্ত থেমে থাকে না। যারা চায় না বিএনপি শক্তিশালী হোক, যারা চায় না বিএনপি দেশপরিচালনা করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলুক, যারা চায় না দেশে সুশাসন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক তারাই শুরু করে ষড়যন্ত্র। হাজার কোটি টাকার ষড়যন্ত্র চলে দেশনায়ক তারেক রহমানের বিরুদ্ধে। কারণ তারেক রহমান কাচের ঘরে বসে রাজনীতি শুরু করেননি। তিনি মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে সবার সাথে হাত মিলিয়ে রাজনীতি শুরু করেছেন। আর দেশের মানুষ আগামীর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাকেই গ্রহণ করতে শুরু করে। আধিপত্যবাদীরাও তাই তারেক রহমানকে হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে।

বাংলাদেশে অনেকে মনে করেন, ১/১১তে তারেককে অচল করার ষড়যন্ত্রের বড় দুটি কারণ হলো; ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পেছনে বড় হেতু ছিল তারেকের সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নির্বাচনী প্রচারণা। দ্বিতীয়ত, জাতীয়তাবাদী শক্তির ভবিষ্যত্ কাণ্ডারী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত হয়ে উঠছিল।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ বিনা অভিযোগে তারেক রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। ৭ মার্চ রাতে বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে নিতে এসেছে। আমি কোনো অপরাধ করিনি, আমার জন্যে দোয়া করবেন।’ এরপর দু’রাকাত নফল নামাজ পড়লেন। মা বেগম জিয়ার অঝোর কান্না আর প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানকে ওরা নিয়ে যায়।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জড়িয়ে মইনগং গুনে গুনে ১৩টি মামলা দিয়েছিল। কোনোটাতেই তারেক রহমান সরাসরি আসামি নন। আসামিদের আগে ধরে তাদের বানানো স্বীকারোক্তি ছিল তারেক রহমানকে ফাঁসানোর অস্ত্র। সেই সব স্বীকারোক্তি পিটিয়ে সাদা কাগজে সই করা হয়েছিল, যা পরে আদালতে প্রত্যাহার হয়েছে। ১৩টি মামলার মধ্যে ১১টি উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত আছে, তারেক রহমান জামিন পেয়েছেন। ‘দিনকাল’ সংক্রান্ত মামলাটি খারিজ হয়ে গেছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সংক্রান্ত মামলাটি আদালতের বিবেচনাধীন রয়েছে, সরকার সময় নিয়েছে। কাফরুল থানায় দ্রুত বিচার আইনের অধীনে ২০০৭-এর ১৭ এপ্রিল যে মামলাটি হয়, তাতে তারেক রহমানকে ফাঁসাতে মরিয়া মইন-ফখরুদ্দীন সরকার দু’দিনের ব্যবধানে দু’বার আইনের সংশোধন করেছিল। কিন্তু হাইকোর্ট তা আমলে নেয়নি। বর্তমান মহাজোট সরকার তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ের করা প্রায় দেড় হাজার মামলা তুলে নিয়েছে। বিএনপি নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মামলাগুলো একচোখা সরকারের দৃষ্টিতে পড়েনি। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে স্থগিত একটি মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন আইন প্রতিমন্ত্রী। আবার তা পুষিয়ে দিতে বর্তমান আমলে মানি লন্ডারিংয়ের একটি মামলায় তারেক রহমানকে জড়ানো হয়েছে। অথচ সেখানেও তিনি মূল আসামি নন।

২০০৭-এর ৩১ ডিসেম্বর রিমান্ডে থাকাকালে আমার ওপর নানা রকমের দৈহিক নির্যাতন করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল অনেক উপর থেকে বার বার ফেলে দেয়া। অসহ্য যন্ত্রণায় আমি কুঁকড়ে উঠেছি। কিন্তু ওইসব অফিসারের বিন্দুমাত্র মায়া-দয়া হয়নি। ওদের দায়িত্ব ছিল আমাকে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলা। তারপর থেকে দীর্ঘ সময় আমি কারাগারে। কোনো ডাক্তার নেই। চিকিত্সা হয়নি। প্রতিটি দিন কেটেছে নারকীয় যন্ত্রণায়। একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, গ্রেফতার চলতে পারে। কিন্তু নির্যাতন করার, শরীরের অঙ্গ বিকল করার, মানবাধিকার পদদলিত করার অধিকার সভ্যতার কোথায় আছে?

আদালতের নির্দেশক্রমে ২৯ জানুয়ারি তাকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে একটি মেডিক্যাল বোর্ড পরীক্ষা করে সুপারিশ করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির জন্য। কোনো চিকিত্সায় কাজ হচ্ছিল না। ৯ জুন অ্যাম্বুলেন্সে করে আদালতে নেয়া হলে কাঠগড়ায় হুইল চেয়ারেও বসে থাকতে পারেননি। এরপর পেইন কিলার দিয়েও তার ব্যথা কমানো যাচ্ছিল না। সে বছরের আগস্টে হাসপাতালের প্রিজন সেলে টয়লেটে পড়ে গিয়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান তিনি। ডিজিএফআই’র প্রবল চাপ উপেক্ষা করে দেশের শীর্ষ চিকিত্সকদের এক মেডিক্যাল বোর্ড তারেক রহমানকে চিকিত্সার জন্য বিদেশে পাঠানোর সুপারিশ করে। বোর্ড দেখতে পায়, নির্যাতনে তারেক রহমানের মেরুদণ্ডের ৬ ও ৭ নম্বর হাড় ভেঙে গেছে। মেরুদণ্ডের ৩৩টি হাড়ের দূরত্ব কমে গেছে। চোখে, হৃদযন্ত্রে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এসবের চিকিত্সা সম্ভব নয়। এখন লন্ডনের শুশ্রূষায় তিনি আগের চেয়ে অনেকটা ভালো। কিন্তু নির্যাতনের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে, হবেও সারা জীবন।

১/১১’র ভয়াবহ স্মৃতি, হাড়-ভাঙার অব্যক্ত যন্ত্রণা; দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না, বাংলাদেশ নিয়ে আর স্বপ্ন দেখবেন কি দেখবেন না—এসবের টানাপড়েন।

কী সব শিরোনাম! মইন-ফখরুদ্দীন সরকারের ছত্রছায়ায় ডিজিএফআই অর্থাত্ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা অফিসের দিবালোকের মতো স্পষ্ট, সে ধিক্কার সত্যভিত্তিক বা প্রামাণিক ছিল না। ‘উইপন্স অব ম্যাস ডেসট্রাকশন’ বা কথিত গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের অছিলায় ইরাকে যেমন হামলা হয়েছিল, তারেক রহমানের মধ্যে অমন মারণাস্ত্র খুঁজতে যেন হামলে পড়েছিল কয়েকজন অতিউত্সাহী কর্মকর্তার বানানো সব কাহিনী লাল শিরোনাম হচ্ছিল অনেক দৈনিকে। কিন্তু আজ কুচক্রীরা। ১/১১’র মূল টার্গেট যেন তারেক রহমান। অথচ কী পাওয়া গেল, জাতির সামনে আজ স্পষ্ট।


৫৫৪ দিনের যন্ত্রণাময় কারাবাস শেষে তিনি এখন প্রবাস জীবন যাপন করছে। ১২টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান।

তারেক রহমান ওয়ান ইলেভেনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, ‘আমাকে নিয়ে তদন্তকারীরা যে সিরিয়াসলি তদন্ত করেছে, তা মনে হয় না। চারশ’ স্যুটকেস ডলারে ভরে সৌদি আরবে পাচারের অভিযোগ তুললে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, একটি ডিসি-১০ বিমানের কার্গোহোলে কত স্যুটকেস আঁটে বা একজন যাত্রী অত স্যুটকেস কীভাবে নিয়ে যেতে পারে—সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা আছে কিনা। এরপর তারা আর সে বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি। সরকার ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ওইসব বিপথগামী অফিসার স্রেফ আক্রোশের বশে আমাকে নির্যাতন করেছে। তদন্তকারীদের কিছু জ্ঞান তো থাকতে হয়। আমাকে নিঃসাড় করে দেয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য।’


কিন্তু দেশনায়ক তারেক রহমানের একটিই দোষ তিনি বাংলাদেশটাকে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। দেশ ও দেশের মানুষকে স্বনির্ভর ও বর্গীমুক্ত করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে জনাব তরেক রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিস্তারের একটা রূপকল্পের পাশাপাশি দেশকে সবল, স্বনির্ভর করার স্বপ্ন—দুটিই একসঙ্গে কাজ করেছে। আমি ব্যাপক জরিপের মধ্য দিয়ে চিহ্নিত করেছিলাম, দেশের কোন থানায় কোথায় এক বিঘার বেশি জমিতে কত ফলের বাগান আছে, মাছের চাষ হচ্ছে। সেসব কৃষক বা উদ্যোক্তাকে সহায়তা করা, দুঃস্থ, কর্মহীনদের উত্পাদনমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করার ছক বানিয়েছিলাম। রাসায়নিক সার আমাদের জমির উর্বর শক্তিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। তাই দেশীয় পদ্ধতির সার ব্যবহার, শিল্প, বিনিয়োগ বৃদ্ধির উপায়সমূহ চিহ্নিত ও বাস্তবায়ন করার বিষয়গুলো আমার কম্পিউটারে সবসময় থাকত। খাল কাটার বিষয়ে বিশদ পরিকল্পনা বানিয়েছিলাম। শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রেখে সেচে ব্যবহার, বন্যার সময় পানি নিষ্কাশন, শহীদ জিয়ার দেশ-জাগানো কর্মসূচিগুলোর পুনরুজ্জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে ছিলাম। কাজও শুরু হয়েছিল।’